Tuesday, May 27, 2014

Kathopakathan # 26 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-
আমার চিঠিটার জবাব কই?
যদি না এনে থাকো তাহলে আজ 
তুলবো দুই হাতে এমন ঝড় 
বসন উড়ে যাবে চন্ডীগড়
খোঁপার খিল খুলে বন্দী চুল 
হানবে চোখে মুখে আক্রমন।
কেউটে সাপ হব। সাত পাকে 
নগ্ন দৃশ্যের চূড়া ও তল 
জড়াবো, এমনই সে আলিঙ্গন 
ভাঙবে হাড়-গোড়। আমার কি?

নন্দিনী-
এমন ছটফটে ধৈর্যহীন 
মানুষ কোনদিন দেখিনি আর।
শুনেছি আজকাল বোদলেয়ার 
রাঁবো আর ভের্লেন পরছো খুব।
এখন সেই সব আগুন-তাপ 
আমারই ঘাড়ে বুঝি আছ্ড়াবে?
চিঠিটা নাও, নিয়ে শান্ত হও।
আমার হাড়-গোড় ভেঙ্গো না আর।
ভাঙলে কার ফুল তুলবে রোজ 
শুনি মশাই?

Kathopakathan # 25 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-
হাত-ঘড়িটা কি ছোঁ মেরেছে গাঙচিলে?
শকুন্তলার আংটির মত গিলেছে কি কোনো রাঘব বোয়াল-টোয়াল?
কেন?
আসবার কথা কখন, এখন এলে?
বসে আছি যেন যুগযুগান্ত, ভাঙা মন্দিরে উপুড় শালগ্রাম।
চা খেলাম, খেয়ে সিগারেট, খেয়ে আবার- বেয়ারা, কফি!
আর ঘড়ি দেখা, এবং যে কোনো জুতোর শব্দে চমকে চমকে ওঠা।
মনে হচ্ছিল অনন্তকাল প্রতীক্ষাটারও অন্য নামটা প্রেম।

নন্দিনী-
সরি, সত্যিই! কি করবো বল রাস্তায় যেন মাছি থকথকে ভিড় 
তারপরে লাল মিছিলে মিছিলে লরিতে লরিতে সব রাস্তায় বন্ধ 
তারপরে এই লু হাঁকানো রোদ, কি যে বিচ্ছিরি! জ্বলে-পুড়ে সব খাক, 
আকাশটার কি ব্যামো হল কিছু? আষাঢ় মাসেও মেঘের কলসী ফাঁকা।
মনে হচ্ছিল শতাব্দী কেটে যাবে 
তবু কোনো দিন লেনিন সরণি পারবে না যেতে শেক্সপীয়রের কাছে।
তারপরে জানো কাল সারারাত ঘুমোইনি, শুধু কেঁদে 
কাঁদব যে তারও সুখ কি কপালে আছে?
পাশে বোন শোয়, পিসিমা খাটের নিচে।

শুভঙ্কর-
হঠাৎ কান্না কেন?

নন্দিনী-
তোমার একটা চিঠি সামহাউ পড়েছে বাবার হাতে।
বাবা গম্ভীর। তার মানে আজ কাল বা পরশু ঘটবে বিস্ফোরণ।
পুরে দেওয়া হবে বিধিনিষেধের গোল গন্ডীর ভিতরে হ্যাঁচকা টানে।

শুভঙ্কর-
যা অনিবার্য, দ্রুত ঘটে যাওয়া ভালো।
আজ সকালের কাগজেই লেখা আছে 
ঘন্টায় আশি মাইল দৌড়ে আসছে বৃষ্টি-ঝড়।
বুঝেছি অতঃপর 
পরিতে হইবে সারা গায়ে রণসাজ।
মনে পড়ে? আমি ভিক্টোরিয়ার মাঠে একদিন শীতের সন্ধেবেলায় 
তোমার শরীর ভর্তি আগুনে সেঁক-তাপ নিতে নিতে 
বলিয়াছিলাম, নন্দিনী! মনে রেখো 
ভালবাসা মানে আমরণ এক রক্ত রণাঙ্গন।

Kathopakathan # 24 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

নন্দিনী-
তোমাকে আজকাল এত রোগা লাগে কেন শুভঙ্কর?
খুব ম্রিয়মান লাগে 
যেন ঘন বর্ষাকাল, মেঘের ধূসর ডানা, জল-কোলাহল 
ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলছে তোমাকে।
ভাঙা কোনো মন্দিরের পুরনো গন্ধের মত লাগে।
অতীতকালের কোনো স্তম্ভে আঁটা শ্যাওলার মত 
অতীতে সবুজ ছিলে, এখন শোকের মত হীন।
তোমাকে কি ঘিরে আছে কোন কারাগার?
গরাদের কালো হাত, ঘন বৃক্ষজাল?
অথবা তুমি কি কিছু হারিয়েছ, অত্যন্ত আপন কোনো কিছু?
সন্ধ্যাতারা ডুবে গেলে কোনো কোনো পাখি শুধু কাঁদে।
তোমার সোনার আংটি জলের গহ্বরে ভেসে গেছে?
তোমার গায়ের সেই চাঁপা রং, চমৎকার শোভন প্রচ্ছদ 
শুভঙ্কর কোথায় হারালে?

শুভঙ্কর-
নন্দিনী, তুমি তো জানো আমার বাগান পাট নেই,
যেটুকু বাগান ছিল শৈশবের সঙ্গে ঝরে গেছে।
তুমি ফুল ভালোবাসো বলে 
তোমাকে ফুলের বৃন্তে মাঙ্গলিক উৎসবের মত লাগে বলে 
আমাকে ফুলের খোঁজে যেতে হয় পথ খুঁজে খুঁজে 
সিন্ধুনদ, হিন্দুকুশ, হরপ্পার মত দূরান্তরে।
সেই সব পথে বহু ভাঙাচোরা বিমানবন্দর 
বহু যুদ্ধ জাহাজের হাড়-গোড়, মেশিনগানের 
কঙ্কাল-কবর, রুঢ় কলকব্জা,-কাঠ-কয়লা-খড়।
সেই সব পথে বহু পতাকার সার কিন্তু প্রাণচিহ্ন নেই।
দুরারোগ্য অসুখের শ্বাসকষ্টে বিদীর্ণ বাতাস 
এবং পাথরও খুব, বড় বড় ডাকাতের মত পাথর।
যেতে যেতে রক্তপাত হয়।
যেতে যেতে সর্বাঙ্গের উদ্যমে ও অভিলাষে, বাসনায়, বাহুতে, বল্কলে 
নীল মরচে পড়ে।

Sunday, May 11, 2014

Kathopakathan # 23 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

নন্দিনী-
কাল তোমাকে ভেবেছি বহুবার 
কালকে ছিল আমার জন্মদিন।
পরেছিলাম তোমারই দেওয়া হার।

শুভঙ্কর-
আমার হার কি আমার চেয়েও বড়?
বালিকে তুমি বিলোলে আলিঙ্গন 
সমুদ্রকে দিলে না কুটো খড়ও।

নন্দিনী-
আমার কি দোষ? ডেকেছি বহুবার 
কিন্তু তোমার এমন টেলিফোন 
ঘাটের মড়া, নেইকো কোনো সাড়।

শুভঙ্কর-
বাতাস ছিল, বাতাসে ছিল পাখি 
আকাশ ছিল, আকাশে ছিল চাঁদ 
তাদের বললে, খবর দিত নাকি?

নন্দিনী-
আজ্ঞে মশাই, বলেছিলাম তাও।
তারা বললে, ধুঁকছি লোডশেডিং-এ,
নড়তে-চড়তে পারব না এক পাও।

Kathopakathan # 22 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-
তেরোই জুলাই কথা দিয়েছিলে আসবে।
সেইমত আমি সাজিয়েছিলাম আকাশে 
ব্যস্ত আলোর অজস্র নীল জোনাকি।
সেই মত আমি জানিয়েছিলাম নদীকে 
প্রস্তুত থেকো, জলে যেন ছায়া না পড়ে 
মেঘ বা গাছের। তেরোই জুলাই এলে না।
জ্বর হয়েছিল? বাড়িতে তো ছিল টেলিফোন।
জানালে পারতে। থার্মোমিটার সাজতাম।
নীলিমাকে ছুঁয়ে পাখি হতো পরিতৃপ্ত।

Kathopakathan # 21 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-
তোমাদের ওখানে এখন লোডশেডিং কি রকম?

নন্দিনী-
বোলো না। দিন নেই, রাত নেই, জ্বালিয়ে মারছে।

শুভঙ্কর-
তুমি তখন কি করো?

নন্দিনী-
দরজা খুলে দিই।
জানলা খুলে দিই।
পর্দা খুলে দিই।
আজকাল হাওয়াও হয়েছে তেমনি ফন্দিবাজ।
যেমনি অন্ধকার, অমনি মানুষের ত্রিসীমানা ছেড়ে দৌড়।

শুভঙ্কর-
তুমি তখন কি করো?

নন্দিনী-
গায়ে জামা-কাপড় রাখতে পারি না।
সব খুলে দিই, 
চোখের চশমা, চুলের বিনুনি, বুকের আঁচল, লাজ-লজ্জা সব।

শুভঙ্কর-
টাকা থাকলে তোমার নাম নতুন ঘাট বাঁধিয়ে দিতুম কাশী মিত্তিরে 
এমন তোমার উথাল-পাতাল দয়া।
তুমি অন্ধকারকে সর্বস্ব, সব অগ্নিস্ফুলিঙ্গ খুলে দিতে পার কত সহজে।
আর শুভঙ্কর মেঘের মত একটু ঝুঁকলেই 
কি হচ্ছে কি?
শুভঙ্কর তার খিদে তেষ্টার ডালপালা নাড়লেই 
কি হচ্ছে কি?
শুভঙ্কর রোদে-পোড়া হরিনের জিভ নাড়ালেই 
কি হচ্ছে কি?
পরের জন্মে দশদিগন্তের অন্ধকার হবো আমি।

Kathopakathan # 20 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

নন্দিনী-
ইলাস্ট্রেটেড উইকলিতে তোমার তিনটে কবিতা ছাপা হল 
আমায় কিন্তু বলনি।
মধুমিতার সঙ্গে দেখা এলিয়াসে, সেই আমাকে বলল।
শুনে এমন রাগ হল যে ভেবেছিলাম বন্ধ করব দেখা।
তুমি কোথায় কি লিখছ তা শুনতে হবে হাটের লোকের মুখে?
সেই রাগেতেই চিঠির জবাব লিখেও তাকে কবর দিয়ে এলাম 
লেপ-তোষকের নীচে।

শুভঙ্কর-
উপরে কাঁটা, নিচে কাঁটা, উঠতে-বসতে লাঠি-ঝাঁটা 
এমনি আমার ভাগ্য।
তোমার কাছেই পেয়েছিলাম শুকনো পাতায় প্রথম বৃষ্টিজল 
তুমিই প্রথম শুনিয়েছিলে সেই বাঁশি যা ক্ষতের মুখে মলম।
তেমনি আজও তোমার মুখেই শুনছি প্রথম 
ইলাস্ট্রেটেড উইকলিটার কথা,
এ পর্যন্ত চোখের দেখাও দেখিনি।
রাগের মেঘটা সরিয়ে দিয়ে এবার একটু প্রসন্ন মুখ তুলুন।

Kathopakathan # 19 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

একটা মজার গল্প তোমায় বলতে ভুলে গেছি।
সেদিন ছিল বেস্পতিবার। আকাশ ছুঁড়ে মারল ঘূর্ণিঝড় 
অমিতাভর সঙ্গে হঠাৎ কলেজ স্ট্রীট-এ দেখা হতেই, এই যে শুভঙ্কর 
কেমন আছিস, এটা-ওটা দু-দশ কথার পর 
আসল প্রশ্ন, এখনো সেই নন্দিনীতেই ডুবে আছিস নাকি?
ইদানীং যা লেখা-টেখা বেরোচ্ছে তা পড়লে মনে হয় 
নন্দিনী তোর আকাশ এবং তুই উড়ন্ত পাখি।
অমিতাভ, তুমি জানই, পলিটিক্সে নিবেদিত প্রাণ 
তাই তাকে বললাম 
নন্দিনীকে ধরিস যদি প্রকান্ড বিপ্লব 
আমি হলাম তার ভিতরের দাবি-দাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্লোগান।

Kathopakathan # 18 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

হ্যালো, হ্যালো, কখন আসছ তুমি?
কোথায় মেঘ? কোথাও মেঘ নেই।
হ্যালো, হ্যালো, বৃষ্টি যদি নামে?
ভিজবে, হ্যালো, ভিজবো, অনায়াসে 
গাছপালারা যেমন করে ভেজে 
ভিজলে তৃণ রাজার ছেলে হয় 
হ্যালো, হ্যালো, বলছি ভিজব জলে 
ভেজা মাটির গন্ধ হবে তুমি 
আমি তাতে ছড়াবো ডালপালা।
শুনতে পাচ্ছো? হ্যালো হ্যালো হ্যালো 
বেরিয়ে পড়, আকাশে রামধনু 
উঠবে, হ্যালো, উঠবে এবার রোদ 
রোদের হাতে বর্শা, হ্যালো হ্যালো 
তোমার পায়ের ঘুঙুর শুনতে পেলে 
সমস্ত মেঘ, আঁধার খসে হ্যালো 
সমস্ত মেঘ আঁধার, হ্যালো হ্যালো 
সমস্ত মেঘ, হ্যালো, হ্যালো হ্যালো।

Tuesday, May 6, 2014

Kathopakathan # 17 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-
নন্দিনী, তুমি একটুখানি তো জল 
অথচ ভাসাও স্রোতের কলস্বরে।

নন্দিনী- 
তুমিও তো মিহি বাতাস, শুভঙ্কর 
অথচ কি করে কাঁপাও সুখের ঝড়ে?

Kathopakathan # 16 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

ওগো সুন্দরী! মনে আছে কাল তেসরা জুন?
সেকি! ভুলে গেছ? তুমি তো দেখছি সাংঘাতিক!
ভুলে গেলে তিথি প্রথম বিবাহ বার্ষিকীর?
আজ্ঞে না এটা ঠাট্টা নি বা ইয়ার্কি।
ফিচেল হাওয়ারা যেভাবে সজনে গাছের চুল 
চুলের বিনুনি ঘেঁটে দিয়ে করে মশকরা 
তুমি কি ভাবছো এটাও তেমনি খেলাচ্ছল?

তুমি যা বলছ স্বীকার করছি। ইয়েস স্যার!
বিয়ে আমাদের হয়নি এবং হবেও না।
তাতে কি হয়েছে? মনে মনে তুমি পার্বতী 
তেসরা জুনের বিকেল থেকেই। সেটা তো ঠিক?

তেসরা জুনেই প্রথম উঠল ঘূর্ণিঝড় 
তেসরা জুনেই প্রথম প্রবল বৃষ্টিপাত 
আকাশে আতর ছুঁড়ল প্রথম কদম ফুল।
একটি রুমালে তোমার হাত ও আমার হাত।

আমরা নিকটবর্তী হলাম তেসরা জুন 
তোমার রথের চাকায় ভাঙল হাড়-পাঁজর 
দেয়াল-দালান-দরজা-বিছানা-পত্তরে 
তোমার হাসির বিদ্যুতরেখা দিল আগুন 
আমরা পরস্পরের হলাম তেসরা জুন।

তেসরা জুনেই আমার আকাশে তোমার চাঁদ 
তোমার হাওয়ায় আমি উড়ো চুল তেসরা জুন 

Kathopakathan # 15 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

তরমুজের বাইরেটা সবুজ 
ভিতরটা লাল।
আচ্ছা বলতো, কেন মনে পড়ল কথাটা?
পারলে না?
তোমার সবুজ শাড়িটার দিকে তাকিয়ে।

Kathopakathan # 14 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

নন্দিনী-
দেখ, অনন্তকাল ঝিঝি পোকার মতো 
আমরা কথা বলছি 
অথচ কোনো কথায় শেষ হল না এখনও।
একটা লাল গোলাপের কান্নার গল্প 
শোনাবে বলেছিলে 
কবে বলবে?

শুভঙ্কর-
চলো উঠি। বড্ড গরম এখানে।

নন্দিনী-
দেখ, অনন্তকাল শুকনো বাঁশপাতার মতো 
আমরা ঘুরছি 
অথচ কেউ কাউকে ছুঁতে পারলুম না এখনো।
একটা কালো হরিনকে কোজাগরী উপহার 
দেওয়ার কথা ছিল 
কবে দেবে?

শুভঙ্কর-
চলো উঠি। বড্ড ঝড়ঝাপটা এখানে।

Kathopakathan # 13 from Kathopakathan Vol 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-

তোমার মধ্যে অনন্তকাল বসবাসের ইচ্ছে 
তোমার মধ্যেই জমিজমা ঘরবাড়ি, আপাতত একতলা 
হাসছো কেন? বলো হাসছো কেন?

নন্দিনী-

একতলা আমার একবিন্দু পছন্দ নয়।
সকাল-সন্ধে চাঁদের সঙ্গে গপ্পোগুজব হবে 
তেমন উঁচু না হলে আবার বাড়ি নাকি?

শুভঙ্কর-

আচ্ছা তাই হবে।
চাঁদের গা ছুঁয়ে বাড়ি,
রহস্য উপন্যাসের মতো ঘোরানো-প্যাঁচানো সিঁড়ি 
বাঁকে বাঁকে সোনালী ফ্রেমে বাঁধানো স্বপ্নদৃশ্য 
শিং-সমেত মায়া-হরিণের মুন্ডু 
হাসছো কেন? বলো হাসছো কেন?

নন্দিনী-
কাটা হরিণ দেয়ালে ঝুলবে, অসহ্য।
হরিণ থাকবে বনে, বন থাকবে আমাদের 
খাট-পালঙ্কের চারধারে 
খাট-পালঙ্কের নীচে ছোট্ট একটা পাহাড় 
পাহাড়ের পেট চিরে ঝর্ণা 

শুভঙ্কর- 
আচ্ছা তাই হবে।
পাহাড় চিরে ঝর্ণা, ঝর্ণার উপরে কাশ্মিরী কার্পেট 
সিলিং-এ রাজস্থানী-ঝাড় জলের ঝাঁঝরির মত উপুড় করা 
জানলার গায়ে মেঘ, মেঘের গায়ে ফুরফুরে আদ্দির 
পাঞ্জাবি 
পাঞ্জাবির গায়ে লখনৌ-ই চিকনের কাজ 
হাসছো কেন? বলো হাসছো কেন?

নন্দিনী-
মেঘ রোজ রোজ পাঞ্জাবি পরবে কেন?
এক একদিন পরবে বালুচরি শাড়ি কিংবা 
খাটাও-এর পাতলা প্রিন্ট 
মাথায় বাগান খোঁপা, খোঁপায় হীরের প্রজাপতি 

শুভঙ্কর-
আচ্ছা তাই হবে।
মেঘ সাজবে জরি-পাড় শাড়িতে 
আর তখুনি নহবতখানার সানাই-এ জয়জয়ন্তী 
আরত খুনি অরণ্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বুনো জানোয়ারের হাঁক ডাক 
খাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে জেগে উঠবে জলপ্রপাত 
শিকারের জন্যে তীর ধনুক, দামামা দুন্দুভি 
হাসছো কেন? বলো হাসছো কেন?

নন্দিনী-
তুমি এমন ভাবে বলছ 
যেন ভালবাসা মানে সাপে আর নেউলে ভয়াবহ 
একটা যুদ্ধ।
ভয় লাগছে।
অন্য গল্প বল।

Sunday, May 4, 2014

Kathopakathan # 12 from Kathopakathan Vol 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-

কাল বিকেলে
তোমার ঘাড়ে চিবুক রেখে প্রকান্ড 
বাঘ কি খুঁজছিল 
দেখতে পেলে?

নন্দিনী-

জানি জানি,
খুঁজছিল তার সুখের নদীর উৎস 
এবং পারাপারের 
শেষ পারানি।

শুভঙ্কর-

সমস্ত রাত 
নিজের বুকের পাথর খুঁড়ে বইয়েছে 
কাল ক্ষতিকারক 
জলপ্রপাত।

নন্দিনী-

লক্ষ্মী সোনা,
আমি তোমার রৌদ্রছায়ায় সর্বক্ষনই 
সঙ্গে হাঁটি 
সমুদ্রতীর কষ্ট দিলে বিছোই বালির 
শীতলপাটি 
বুকের কাছে নেই তবুও তোমার 
বুকেই বসতবাটি 
ভুল কোরো না।

Saturday, May 3, 2014

Kathopakathan # 11 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

- তুমি আজকাল বড় সিগারেট খাচ্ছ শুভঙ্কর।
- এখুনি ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি।
  কিন্তু তার বদলে?
- বড্ড হ্যাংলা। যেন খাওনি কখনো?
- খেয়েছি।
  কিন্তু আমার খিদের কাছে সে সব নস্যি।
  কিন্তু কলকাতাকে এক খাবলায় চিবিয়ে খেতে পারি আমি।
  আকাশটাকে ওমলেটের মতো চিরে চিরে 
  নক্ষত্রগুলোকে চিনেবাদামের মতো টুকটাক করে 
  পাহাড়গুলোকে পাঁপর ভাজার মতো মরমরিয়ে 
  আর গঙ্গা?
  সে তো এক গেলাস সরবত।
- থাক। খুব বীরপুরুষ।
- সত্যি তাই।
  পৃথিবীর কাছে আমি এই রকমই ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ।
  কেবল তোমার কাছে এলেই দুধের বালক
  কেবল তোমার কাছে এলেই ফুটপাথের নুলো ভিখারী 
  এক পয়সা, আধ পয়সা কিংবা এক টুকরো পাউরুটির বেশী 
  আর কিছু ছিনিয়ে নিতে পারি না।
- মিথ্যুক।
- কেন?
- সেদিন আমার সর্বাঙ্গের শাড়ি ধরে টান মারনি?
- হতে পারে।
  ভিখারীদের কি ডাকাত হতে ইচ্ছে করবে না একদিনও?

Friday, May 2, 2014

Kathopakathan # 10 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

- কাল বাড়ি ফিরে কি করলে?
- কাঁদলাম। তুমি?
- লিখলাম।
- কবিতা? কই দেখাও।
- লিখেই কুচিকুচি।
- কেন?
- আমার আনন্দের ভিতরে অনর্গল কথা বলছিল আর্তনাদ 
  আর্তনাদের ভিতরে গুনগুন গলা ভাঁজছিল অদ্ভুত এক শান্তি 
  আর শান্তির ভিতরে সমুদ্রের সাঁই সাঁই ঝড়।
  যে-সব অক্ষর লিখলেই লাল হবার কথা 
  তারা হয়ে যাচ্ছিল সাদা।
  যে সব শব্দ সাদা কাশবন হয়ে দুলবে 
  তাদের মনে হচ্ছিল শুকনো ঝাউপাতার ওড়াউড়ি।
  বুঝলাম সে ভাষা আমার জানা নেই 
  যার আয়নায় নিজের মুখ দেখবে ভালোবাসা।
- তাই বলে ছিঁড়ে ফেললে?
- বাতাস থেকে একটা অট্টহাসি লাফিয়ে উঠে বললে 
  পিদিমের সলতে হয়ে আরো কিছু দিন পুড়ে খাক হ।
  পুড়ে খাক হ।

Kathopakathan # 9 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-

আজ তোমাকে অনেক নামে ডাকতে ইচ্ছে করছে।
ডাকবো?
আজকে তুমি প্রথম শ্রাবণ, সঙ্গে চাঁপার গন্ধ 
মাখবো?

গভীরতর গানের ভিতর খেয়া দেওয়ার নৌকো 
চলছে।
একটু আগে হাসলে যেন আকাশ সোনার আংটি 
গলছে।

এখন তোমায় 'কুরুস কাঠি' এই নামেতে ডাকবো 
শুনছো?
ছিলাম সুতো, তাকে হাজার চৌকো ও গোল নকশায় 
বুনছো।

Kathopakathan # 8 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-

উত্তরোত্তর অত্যন্ত বাজে হয়ে উঠছ তুমি।
আজ থেকে তোমাকে ডাকব 
চুল্লী।
কেন জানো? কেবল পোড়াচ্ছ বলে।
সুখের জন্য হাত পাতলে যা দাও 
সে তো আগুনই।

নন্দিনী-

উত্তরোত্তর অত্যন্ত যা-তা হয়ে উঠছ তুমি 
আজ থেকে আমিও তোমাকে ডাকব 
জল্লাদ।
কেন জানো? কেবল হত্যা করছ বলে।
তোমাকে যা দিতে পারি না, তার দুঃখ 
সে তো ছুরিরই ফলা।

Kathopakathan # 7 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-

তোমার চিঠির আজ বিকেলের চারটে নাগাদ
পেলাম।
দেরী হলেও জবাব দিলে, সপ্তকোটি
সেলাম।
আমার জন্যে কান্নাকাটি? মনকে পাথর 
বানাও।
চারুলতা আসছে আবার। দেখবে কিনা 
জানাও।
কখন কোথায় দেখা হচ্ছে লেখোনি এক 
ফোঁটাও।
পিঠে পরির ডানা দিলে, এবার হাওয়ায় 
ছোটাও।
আসবে কি সেই রেস্টুরেন্টে, সিতাংশু যার 
মালিক?
রুপোলী ধান খুঁটবে বলে ছটফটাচ্ছে
শালিক।

Kathopakathan # 6 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

শুভঙ্কর-

কালকে এলে না, আজ চলে গেল দিন 
এখন মেঘলা, বৃষ্টি অনতিদূরে।
ভয়াল বৃষ্টি, কলকাতা ডুবে যাবে।
এখনো কি তুমি খুঁজছো নেলপালিশ?

শাড়ি পরা ছিল? তাহলে এলে না কেন?
জুতো ছেঁড়া ছিল? জুতো ছেঁড়া ছিল নাকো?
কাজল ছিল না? কি হবে কাজল পরে 
তোমার চোখের হরিণকে আমি চিনি।

কালকে এলে না, আজ চলে গেল দিন 
এখন গোধুলি, এখুনি বোরখা পরে 
কলকাতা ডুবে যাবে গাঢ়তর হিমে।
এখনো কি তুমি খুঁজছো সেফটিপিন?

Thursday, May 1, 2014

Kathopakathan # 5 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

  আমি তোমার পান্থপাদপ 
  তুমি আমার অতিথশালা।
  হঠাৎ কেন মেঘ চেঁচালো 
- দরজাটা কই, মস্ত তালা?

  তুমি আমার সমুদ্রতীর 
  আমি তোমার উড়ন্ত চুল 
  হঠাৎ কেন মেঘ চেঁচালো 
- সমস্ত ভুল, সমস্ত ভুল?

  আমি তোমার হস্তরেখা 
  তুমি আমার ভর্তি মুঠো।
  হঠাৎ কেন মেঘ চেঁচালো 
- কোথায় যাবি, নৌকো ফুটো?

Kathopakathan # 4 from Kathopakathan Vol. 1 by Purnendu Patri

- যে কোনো একটা ফুলের নাম বল 
- দুঃখ।
- যে কোনো একটা নদীর নাম বল।
- বেদনা।
- যে কোনো একটা গাছের নাম বল 
- দীর্ঘশ্বাস।
- যে কোনো একটা নক্ষত্রের নাম বল 
- অশ্রু।
- এবার আমি তোমার ভবিষ্যত বলে দিতে পারি 
- বলো।
- খুব সুখী হবে জীবনে।
  শ্বেতপাথরে পা।
  সোনার পালঙ্কে গা।
  এগোতে সাতমহল 
  পিছোতে সাতমহল।
  ঝর্নার জলে স্নান
  ফোয়ারার জলে কুলকুচি।
  তুমি বলবে, সাজব।
  বাগানে মালিনিরা গাঁথবে মালা 
  ঘরে দাসীরা বাটবে চন্দন।
  তুমি বলবে, ঘুমবো।
  অমনি গাছে গাছে পাখোয়াজ, তানপুরা,
  অমনি জ্যোৎস্নার ভিতরে এক লক্ষ নর্তকী।
  সুখের নাগরদোলায় এইভাবে অনেকদিন।
  তারপর 
  বুকের ডান পাঁজরে গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে 
  রক্তের রাঙা মাটির পথে সুরঙ্গ কেটে কেটে 
  একটা সাপ 
  গায়ে বালুচরীর নকশা 
  নদীর বুকে ঝুঁকে পড়া লাল গোধুলি তার চোখ 
  বিয়েবাড়ির ব্যাকুল নহবত তার হাসি,
  দাঁতে মুক্তোর দানার মত বিষ,
  পাকে পাকে জড়িয়ে ধরবে তোমাকে 
  যেন বটের শিকড় 
  মাটিকে ভেদ করে যার আলিঙ্গন।
  ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত হাসির রঙ হলুদ 
  ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত সোনার গয়নায় শ্যাওলা 
  ধীরে ধীরে তোমার মখমল বিছানা 
  ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে সাদা।
- সেই সাপটা বুঝি তুমি?
- না।
- তবে?
- স্মৃতি।
  বাসরঘরে ঢোকার সময় যাকে ফেলে এসেছিলে 
  পোড়া ধূপের পাশে।